আজ নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের জন্মদিন

68 views

ফিচার বিভাগ: আজ ১৮ আগস্ট অমিত প্রতিভাবান, রবীন্দ্রোত্তর বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ নাট্যকার সেলিম আল দীনের জন্মদিন। ১৯৪৯ সালের এই দিনে ফেনী জেলার সোনাগাজী থানার সেনেরখিল গ্রামে তিনি জন্ম লাভ করেন।

 

মফিজউদ্দিন আহমেদ ও ফিরোজা খাতুনের তৃতীয় সন্তান ড. সেলিম আল দীন। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে ফেনী, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রংপুরের বিভিন্ন স্থানে। সেলিম আল দীনের বাবা ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা। সেই সূত্রে ঘুরেছেন বহু জায়গা। ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি ছিল তাঁর প্রবল ঝোঁক। তাই নতুন বই দেখলেই পড়ে ফেলতেন এক নিমিষেই।

 

সেলিম আল দীন ১৯৬৪ সালে ফেনীর সেনেরখিলের মঙ্গলকান্দি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে ফেনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে গিয়ে ভর্তি হন টাঙ্গাইলের করটিয়ায় সাদত কলেজে। সেখান থেকে স্নাতক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

 

লেখক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬৮ সালে, কবি আহসান হাবিব সম্পাদিত দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার মাধ্যমে। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের নিয়ে লেখা তাঁর বাংলা প্রবন্ধ ‘নিগ্রো সাহিত্য’ ছাপা হয় ওই পত্রিকায়। ১৯৯৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যে নাটকের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সেলিম আল দীন।

 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই নাটকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন সেলিম আল দীন, যুক্ত হন ঢাকা থিয়েটারে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শেষে যোগ দেন বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘বিটপী’তে কপি রাইটার হিসেবে। ১৯৭৪ সালে তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরই বেগমজাদী মেহেরুন্নেসার সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। তাদের একমাত্র সন্তান মইনুল হাসানের অকালমৃত্যু হয়।

 

বাংলাদেশে একমাত্র বাংলা নাট্যকোষেরও তিনি প্রণেতা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণকেন্দ্রিক এথনিক থিয়েটারেরও তিনি উদ্ভাবনকারী। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সেলিম আল দীন ১৯৮১-৮২ সালে নাট্য নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফকে সাথী করে গড়ে তোলেন গ্রাম থিয়েটার।

 

তাঁর প্রথম রেডিও নাটক ‘বিপরীত তমসায়’ ১৯৬৯ সালে এবং টেলিভিশন নাটক আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় লিব্রিয়াম (পরিবর্তিত নাম ‘ঘুম নেই’) প্রচারিত হয় ১৯৭০ সালে। আমিরুল হক চৌধুরী নির্দেশিত এবং বহুবচন প্রযোজিত প্রথম মঞ্চনাটক ‘সর্প বিষয়ক গল্প’ মঞ্চায়ন করা হয় ১৯৭২ সালে।

 

তিনি শুধু নাটক রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বাংলা ভাষার একমাত্র নাট্যবিষয়ক কোষগ্রন্থ ‘বাংলা নাট্যকোষ’ সংগ্রহ সংকলন, প্রণয়ন ও সম্পাদনা করেছেন। তাঁর রচিত ‘হরগজ’ নাটকটি সুয়েডীয় ভাষায় অনূদিত হয় এবং এ নাটকটি ভারতের রঙ্গকর্মী নাট্যদল হিন্দি ভাষায় মঞ্চায়ন করেছে।

 

জীবদ্দশায় তিনি একজন নাট্যকার হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করলেও নাট্যকার পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, গবেষক, সংগঠক, নাট্যনির্দেশক এবং শিল্পতাত্ত্বিক।

 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠা সেলিম আল দীনের হাত ধরেই। ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। ১৯৮১-৮২ সালে আমৃত্যু শিল্পসঙ্গী নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন গ্রাম থিয়েটার। মূলত, ঢাকা থিয়েটারের সাংগঠনিক কাঠামো থেকে তিনি তাঁর সুবিস্তৃত নিরীক্ষামূলক নাট্য রচনা ও তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

 

সেলিম আল দীনের প্রথমদিককার নাটকের মধ্যে ‘সর্পবিষয়ক গল্প’, ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘মূল সমস্যা’ নাটকের নাম ঘুরে ফিরে আসে। সেই সঙ্গে ‘প্রাচ্য’, ‘কীত্তনখোলা’, ‘বাসন’, ‘আততায়ী’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘হাত হদাই’, ‘যৈবতী কন্যার মন’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ ও ‘চাকা’ তাকে ব্যতিক্রমধর্মী নাট্যকার হিসেবে পরিচিত করে তোলে।

 

পাশাপাশি রয়েছে ‘শকুন্তলা’, ‘হরগজ’, ‘প্রাচ্য’, ‘ধাবমান’, ‘স্বর্ণবোয়াল’, ‘পুত্র’, ‘বনপাংশুল’। তাঁর রচিত গীতিনৃত্যনাট্য ‘স্বপ্ন রমণীগণ’ ও ‘ঊষা উৎসব’। জীবনের শেষ ভাগে ‘নিমজ্জন’ নামে মহাকাব্যিক এক উপাখ্যান বেরিয়ে আসে সেলিম আল দীনের কলম থেকে।

 

২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি দেশজ নাট্য ও সংস্কৃতির এই অনুসন্ধানী পথিকৃৎ অগণিত ভক্ত-অনুসারীদের শোকের সাগরে ভাসিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। সেলিম আল দীনের নাটক ভারতের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। নাট্যচর্চায় অসামান্য অবদানের জন্য সেলিম আল দীন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার-সম্মাননা লাভ করেন।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

*