নাট্যজন খায়রুল আলম সবুজের বর্ণিল দিনগুলি

214 views

বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতি জগতে চিরসবুজ একটি নাম খায়রুল আলম সবুজ। যিনি পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে দেশকে মুক্ত করতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। স্বাধীনচেতা এই মানুষটি নিজেকে মেলে ধরেছেন শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায়। তিনি একধারে লেখক, কবি, অনুবাদক, কণ্ঠশিল্পী, নাট্যকার, অভিনেতা, পরিচালক ও নাট্য নির্দেশক। অধ্যাপনাও করেছেন দেশে ও দেশের বাইরে। কিন্তু তাঁর মন সাঁয় দেয়নি চাকুরীতে।  তিনি শিল্পবাড়ির প্রতিটি কক্ষে পা রেখেছেন বীরদর্পে। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি হয়েছেন সফল। তবে জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসাব মেলাননি কখনও। তাই হতাশার কালো মেঘ উঁকি দেয়নি তাঁর জীবনে। মুক্তিযুদ্ধে  যেমন পরাজিত করেছেন শত্রুদের, তেমনি জীবন যুদ্ধে পরাজিত করেছেন লোভ লালসা কে। নিজের কাছে যখন যেটা ভাল মনে হয়েছে তখন সেটাই করেছেন। তাঁর হাত ধরে শিল্প সংস্কৃতি বীজ রোপিত ও অঙ্কুরিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন ম হামিদের সঙ্গে ডাকসু নাটক বিভাগ ‘নাট্যচক্র’ গড়ে তোলেন। ম. হামিদ ছিলেন সভাপতি আর সবুজ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ‘নাট্যচক্র’র মাধ্যমেই নাটকের এক বৈপ্লবিক আন্দোলন শুরু হয়। আর এ গুরুদায়িত্বের কারণে সংগীত চর্চায় ভাটা পরে তাঁর। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন।৭৫ এর আগস্টের পর  সক্রিয় রাজনীতি থেকে ফিরে আসেন তিনি। আমরা এই গুণী শিল্প ও সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব খায়রুল আলম সবুজের বর্ণিল জীবনের স্বপ্নীল কর্মময় জীবনের কথা শুনতে হাজির হয়েছিলাম তাঁর ইস্কাটনের বাসায়। ওখানে কথা হয় খায়রুল আলম সবুজের সহধর্মিণী শিরীন আলম ও তার এক মেয়ে প্রতীতি পূর্ণার সাথে। মুখোমুখির এই সাক্ষাতকারটি গ্রহন করেছেন – শারমিন ইসলাম

 

আপনার জন্ম কোথায়? কত সালে?

আমার জন্ম বরিশালের পূর্ব নারায়ণপুরের উজিরপুরে ১৯৪৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি।

 

আপনার শিক্ষা জীবন নিয়ে কিছু বলুন?

আমার স্কুল জীবনের হাতে ঘড়ি বরিশালে। পরবর্তীতে আমি ১৯৬৭ সালে করাচির বাংলা স্কুল থেকে মানবিক ও ১৯৬৯ সালে বাংলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করি। ওখান থেকে ১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ ঢাকায় চলে আসি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর (ইংরেজি) করি ।

 

অভিনয়ে সম্পৃক্ততা কিভাবে?

আমি ছেলে বেলায় দেখতাম আমার বড় ভাইয়েরা অভিনয় করত। আমি ও তাদের সাথে থাকতাম ও নাটক দেখতাম। এভাবে নাটকের প্রতি ভালবাসা। আমার বয়স যখন ১২ বছর তখন থেকে বরিশালে থাকাকালীন অভিনয় করি। তখন পাড়ায় মঞ্চদল করে নাটকে অভিনয় করতাম। আমার অভিনীত প্রথম মঞ্চ নাটক ছিল ‘সূর্যমুখী’। এরপর পাকিস্তানের করাচিতে পড়াশোনা করতে চলে যাই।

 

করাচিতে যাওয়ার পর কি শিল্প সংস্কৃতির সাথে যুক্ত ছিলেন?

সেখানে অনার্সের শুরু পর্যন্ত গান করতাম এবং অভিনয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। ১৯৭০ সালে পিটিভিতে (পাকিস্তান টেলিভিশন) প্রথম গান করি। ১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ ঢাকায় চলে আসি। এসে ভর্তি হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে। সেখানে ম. হামিদের সঙ্গে ডাকসু নাটক বিভাগ ‘নাট্যচক্র’ গড়ে তুলি। ম. হামিদ ছিলেন সভাপতি আর আমি  ছিলাম সাধারণ সম্পাদক। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ‘নাট্যচক্র’র মাধ্যমেই নাটকের এক বৈপ্লবিক আন্দোলন শুরু করি আমরা। নাট্যচক্র থেকেই সেলিম আল দীন ও আল মনসুরের লেখা দুটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। এরপর ‘থিয়েটার’-এ যোগ দেই। এই দলের হয়ে মঞ্চে ২২ বছর অভিনয় করেছি। থিয়েটারের হয়ে অভিনয় করেছি ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘এখানে এখন’, ‘ওথেলো’, ‘সেনাপতি’সহ আরও বেশকিছু নাটক। এই দলের হয়ে নিদের্শনা দেই নিজেরই অনুবাদ করা নাটক ‘আন্টিগোনে’। এটি একটি ফরাসি নাটকের অনুবাদ ছিল।

 

বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্পৃক্ত হওয়ার কথা বলুন?

বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রথম অভিনয় করি প্রয়াত আতিকুল হক চৌধুরী পরিচালিত ‘জলের রঙ্গে লেখা’ নাটকে। পরে ধারাবাহিক নাটক ‘ঢাকায় থাকি’ তে অভিনয় করি ।

 

টেলিভিশনে আপানার অভিনীত কয়েকটি নাটকের নাম বলুন?

মীর সাব্বির পরিচালিত আরটিভির দর্শকপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘নোয়াশাল’ ও এটিএন বাংলায় প্রচার চলতি ধারাবাহিক ‘সাতটি তারার তিমির’-এ। আদর আলীর ভ্যান , কোথাও কেউ নেই ,ঢাকায় থাকি , রূপকথা , দেয়াল ,  চোরাবালি ও চোখ ।

 

আপনি বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চলচ্চিত্রে  আপনার অভিষেকের কথা বলবেন কি?

পুনে ইন্সটিটিউট থেকে নির্মিত ‘উজান’ চলচ্চিত্র প্রথম অভিনয় করি। এরপর ‘ছাড়পত্র’ নামক একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রেও অভিনয় করি। তাছাড়া বেলাল আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’, সালাহউদ্দিন লাভলুর ‘মোল্লাবাড়ীর বউ’ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছি।

 

আপনার অভিনীত বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের নাম বলুন ।

হরিযূপীয়া (২০১৫) মেহেরজান (২০১১)  নন্দিত নরকে (২০০৬) শোভনের স্বাধীনতা , ভয়ংকর সুন্দর ও মোল্লাবাড়ীর বউ।

 

নাটকের শুটিং সেটে ভক্তের কাছ থেকে ২০ টাকা উপহার পেয়েছিলেন? এ ব্যাপারে যদি কিছু বলতেন ।

জয়পুরহাটের তিরমনিঘাট এলাকায় ‘আদর আলীর ভ্যান’ নাটকের শুটিংর জন্য গিয়েছিলাম। এমন সময় হাতে ডিম নিয়ে যাচ্ছিলেন একজন পান দোকানি। আমাকে দেখে তিনি সেখানে থামেন। দৃশ্যধারণ শেষ হওয়ামাত্র কাছে আসেন ওই ব্যক্তি।  উপহার হিসেবে পকেট থেকে ২০ টাকার একটি নোট বের করে দেন। টাকা নিতে না চাইলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর জোরাজুরিতে নিতে বাধ্য হই। এমন উপহারে চোখে পানি আসে আমার। আমি যে মানুষটার কাছ থেকে এটা পেয়েছি তাঁর মূল্য অসীম। এ অনুভূতি অনির্বচনীয়। গোটা জীবন অভিনয় করে এমন উপহার পাইনি। ভক্তের কাছ থেকে এমন ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও স্নেহ আমাকে বিস্মিত করেছে। এঁদের কারণেই আসলে অভিনয় করা। এঁরাই আমাদের বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।

 

ভক্তদের এরকম আরও উপহারের সমুক্ষীন হয়েছেন কি?  

আরও অনেক এমন স্মৃতি আছে। তবে এ মুহূর্তে যেটি মনে পড়ছে সেটি হল – আমি সাধারণত সাদামাটা পোশাকে থাকতে পছন্দ করি। একদিন মগবাজারে আমার রিকশার সামনে একটি গাড়ি হঠাৎ থামিয়ে জানালার গ্লাস খুলে বললেন – ভাইয়া রাস্তায় বেরুনোর আগে চুল গুলো অন্তত কালো করে বের হতে পারতেন।

 

ভক্তদের জন্য আপানার লেখা ও অনুবাদ করা কয়েকটি বইয়ের নাম বলবেন কি ?   

আমার লেখা ও অনুবাদ করা বই গুলো হচ্ছে  এ এনিমি অব দ্যা পিপল , সোফিয়া লোরেনঃ তাঁর আপন কথা , চিরায়ত সেক্সপিয়ার , দ্যা পিলারস অব সোসাইটি , শোভনের মহারাজ , অদ্ভুত দিনরাত্রির , নির্বাচিত কিশোর গল্প , ছোট ছোট মেঘ , লিইংকনের সোনালি ভাষণ , মন্তাজ গায়েন , গোস্টস , দ্যা লিগ অব ইউথ , ভালোবাসা বোঝেনি পাখি , সোনামনি তোমায় দিলাম , পনির ও তিতু মামু , রোজমার সোম , আন্তেগনি , গল্প সমগ্র , বন্ধুত্ব , জলপাই পাতা ঝরেছিল , হেনরিক ইবসেন এর তিনটি নাটক , আকাশের কাছে বাড়ি , লাল টুকটুকে কমলা , হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর খোঁজে , ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে , গল্পগুলো তোমার জন্য , উপেনের জমি , পবিত্র ও আড্ডাবাজ কয়েকজন , বুড়ো বট ও শকুন , পাতা , সমকালীন উপন্যাস –দিনান্তে দিন , গাংচিল ও ইউরিডাইস।

 

আমরা জানি আপনি একজন কণ্ঠশিল্পী। সম্প্রতি  আপনার কণ্ঠে  এক সঙ্গীত সন্ধ্যায় আমারও দেশেরও মাটিরও গন্ধে‘, ‘তুমি সন্ধ্যা আকাশের তারার মতো‘, ‘আমার সাধ না মিটিলো আশা না ফুরালো‘, ‘বসে আছি পথ চেয়েপ্রভৃতি গান শুনে উপস্থিত অনেকেই একটু চমকে গিয়েছিল। গানে আমরা অভিনয়ের মত সেভাবে পাচ্ছি না কেন ?

সঙ্গীত একটি সাধনার জায়গা। অন্যান্য শিল্পর চেয়ে এই শিল্পে সাধনা করতে হয় বেশি। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে গুরু দায়িত্বের কারণে সাধনায় ব্যাঘাত ঘটে। সেই থেকে গানকে সেভাবে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারিনি।

 

আপনি শিল্প জগতে বহু মাধ্যমে কাজ করেছেন৷ আপনি একধারে আবৃতি শিল্পী , অভিনেতা , নাট্যকার , নাট্য নির্দেশক , পরিচালক ও কণ্ঠশিল্পী। আবার একই সাথে মঞ্চ , বেতার , টিভি ও চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। এত গুলো শাখায় কাজ করছেন কিভাবে যদি বলতেন?

আমি মুলত যা করি ভালো লাগার জায়গা থেকে করি। আর করি বলে এগুলো আমার কাছে ঐভাবে কাজ মনে হয়না। এটি একটি কারণ। আরেকটি বলতে গেলে আমি বলবো – এগুলো আসলে ভিন্ন ভিন্ন কিছু নয়। সবগুলোর সমন্বয়ে এগুলো একটি বাড়ির একেকটি ঘর। আমার বাড়ির আমি একটি ঘরে যাব অন্য ঘরে যাব না এমনটি হয় কি কখন? তাই আমি মনে করি শিল্প বাড়ির প্রতিটি ঘরে ঘরে যাওয়া উচিত।

 

জীবন সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কি?

আমি পূর্বে বলেছি আমি যা কিছু করি আমার ভালো লাগা থেকে করি।  তাই জীবনের এ পর্যায়ে এসে কখনোই আফসোস হয়নি অভিনেতা না হয়ে অন্যকিছু হলে হয়তো জীবন আরও সুন্দর হতো। বরং প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে, অভিনেতা হয়েই জীবনে অনেক সম্মান পেয়েছি। পেয়েছি দর্শকের ভালোবাসা। এই যে তোমারা এসেছ এটাই আমার তৃপ্তির জায়গা।

 

নতুন প্রজন্ম যারা অভিনয়ে আসতে চান তাদের ব্যাপারে আপানার পরামর্শ ?

শিখে আস। শিক্ষিত হয়ে আসো। তাহলে তোমার অবস্থান দৃঢ় হবে।

 

ধন্যবাদ আপনাকে আপনার মূল্যবান সময়ের জন্য

তোমাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ।

 

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY

*