বইমেলাকে বছর জুড়ে বিস্তার করতে হবে- জয়ন্ত জিল্লু

786 views

এস কে মিনার

লেখক জয়ন্ত জিল্লু। কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার সবুজে ঘেরা পাহাড় বিস্তৃত শিলখালি ইউনিয়নের জারুলবনিয়া গ্রামে যার জন্ম। গ্রামের সাদাসিধে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করলেও সাহিত্য প্রীতি দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রকাশিত হয়েছে একটি কাব্য ও একটি গল্প গ্রন্থ। কথা বলেন কথা কবিতার ঘ্রাণের সাথে-

এক দম শুরু থেকে শুরু করি, আপনার ছোট বেলা সম্পর্কে যদি আমাদের বলেন?

আমার ছোটবেলা সাদাসিধে, সাধারণ মুসলমান পরিবারের রীতি-নীতির ভেতর দিয়ে কেটেছে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হচ্ছে, এনজিও’র ব্র‍্যাক স্কুলের পাঠ গ্রহণ;  সাপ্তাহিক দেয়ালিকা অংকন, ‘আলো’ ও ‘গণকেন্দ্র’ নামক পত্রিকার স্বাদ পাওয়া। সঙ্গে বন্ধুদের সাথে হারবাং বিলে শাপলা তুলতে যাওয়া শৈশবের উল্লেখযোগ্য আমলনামা হিসেবে বর্ণনা করা যায়।

আপনার লেখা-লেখির শুরু কখন কি ভাবে হল?

লেখালেখির শুরুটা কখন কীভাবে হলো বলাটা মুশকিল। মুশকিল এই কারণে, সে সময়কার অনেক লেখা হারিয়ে গেছে, কিংবা পুড়িয়ে ফেলেছি। মনে রাখার মতো যদি বলি, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বোধহয় টুকটাক লেখালেখির শুরু। এর আগেও লিখেছি, কিন্তু মনে নেই। তবে হ্যাঁ, একদম আদি-আরম্ভ যদি বলি তাহলে সেই ব্র্যাক স্কুলের দেয়ালিকায় ছবির সাথে ভুল ছন্দে বর্ণনা।

প্রথম ছাপা হওয়া লেখা ও অনুভূতি কেমন ছিল?

প্রথম ছাপা লেখাটার কথাও ইতোমধ্যে ভুলে গেছি। একটা ইসলামিক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। তারিখ মনে নেই। সম্ভবত ২০০২ সালে। নিজের লেখা নয়, নাম দেখে মিষ্টি একটা ভালোলাগার অনুভূতি হয়েছিল।

আপনার প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘পৃথিবীর কোথাও রাস্তা দেখিনা’ সম্পর্কে যদি বলেন?

এটা আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশিত হয় চট্টগ্রামের ‘তৃতীয় চোখ’ থেকে ২০১৪ সালে। এই বইটিকে ঘিরে আবেগ, অনুভূতি সবই প্রখর ছিল। প্রেস থেকে বইমেলা পর্যন্ত, এমনকি এখনো বইটিকে ঘিরে রয়েছে ভালোবাসা, নিজের অদ্ভুত ভালোলাগা। বইটিতে ৩৭টি কবিতা রয়েছে। সবচেয়ে, ভালো লাগে যখন অনেকেই বইটি ভালোলাগার কথা ব্যক্ত করেন।

পর পর ১৪, ১৫ সালে দুইটি বই প্রকাশিত হয়, ১৬ সালে কোন বই নেই,কেন?

২০১৬ তে বই প্রকাশের আগ্রহটা ছিল। কিন্তু নিজেকে আরেকটু গুছিয়ে নিতে চেয়েছি বলে আর বই করা হয়নি। ভেবেছিলাম, ২০১৬-তে একটা যতি দরকার; একটা সামান্য বিরতি। এবং তাই হলো।

জয়ন্ত জিল্লু আপনার দ্বিতীয় বই গল্প গ্রন্থ ‘ছায়া শরীরের গল্প’ , কবিতা থেকে গল্পে গেলেন কেন?

গল্প এর আগে লেখা হয়েছিল, কিছু প্রকাশিতও ছিল। তবে, আসাটা হুট করে। বলতে গেলে কবিতার মতো গল্পে আমার সময় দেওয়া হয়েছে কম। আমি ব্যক্তিগতভাবে গল্পগ্রন্থটিকে একটা আর্কাইভ হিসেবে দেখি।

সাহিত্য চর্চা ও চট্রগ্রাম?

আমি চট্টগ্রামে পা রাখি ২০০২ সালে। সে সময়টায় প্রচুর সাহিত্য-আড্ডা হতো চট্টগ্রামে। বিশেষত ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের ভেতর অনেক সাহিত্য আড্ডায় আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এই মুহূর্তে “চর্চাপীঠ” ও “বিশদ বাঙলার” কথা বলতে পারি। তাছাড়া, ছোট ছোট লিটলম্যাগ কেন্দ্রিক আড্ডাগুলোও ছিল। চকবাজারের “সবুজ আড্ডা” নামও একটা মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বর্তমানে দেশের বড় বই বিপনী “বাতিঘর” হওয়াতে এখন আড্ডা, কিংবা সাহিত্যচর্চা অনেকাংশে ওইদিকে ঝুলে পড়েছে। সন্ধ্যায়, বিশেষত শুক্রবার বাতিঘর চট্টগ্রামের সব কবি লেখকের একটা মিলন মেলায় পরিণত হয়। তাছাড়া, চট্টগ্রামের লিটলম্যাগ চর্চাকে সাহিত্যের জন্য উপাদেয় হিসেবে দেখা যেতে পারে। সর্বদিক বিবেচনায় ধরলে, চট্টগ্রাম এখন পুরোপুরি সাহিত্য চর্চার জায়গা, যেখানে এর বিস্তার বিশ্বব্যাপি।

বাতিঘর একটি বিপণী বিতান, মানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, তাহলে কি সাহিত্য পুঁজির জালে আটকে গেছে?

পুঁজির জালে আসলে পুরো পৃথিবী আটকে গেছে। একটা পাণ্ডুলিপি যখনই বই হিসেবে প্রকাশিত হয়, তখন সেটা একটা প্রোডাক্ট বা পণ্য হয়ে যায়। এর গায়ে মূল্য আটকানো থাকে। আর, মূল্য নিজেই একটা চাহিদা তৈরি করে, ক্রেতার গ্রাফ নির্ধারণ করে। সে হিসেবে বইয়েরও ডিসপ্লে হওয়ার দরকার ছিল। যেখানে পাঠক যাবে, বই স্পর্শ করবে, পড়বে; ভালো লাগলে কিনবে নাহলে চলে আসবে। বাতিঘর ও-রকম একটা জায়গা। এর একটা বানিজ্যিক উদ্দেশ্য থাকলেও সেটার ফলাফল সুন্দর; এবং একে পজিটিভলি নেওয়া যায়।

বাতিঘর যখন ছিল না তখনো আড্ডা হত, তাহলে কি এখন সে সব জায়গা হারিয়ে গেছে?

বাতিঘরের আগের আড্ডাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল। এমনিতেই সাহিত্যে ডান-বামের দুই ধারা প্রচলিত আছে; তার উপর সিন্ডিকেট-ঠিক এই জায়গায় বাতিঘর সব কবি লেখককে একটা জায়গায় দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। যেটা আমি খুব জরুরি বলে মনে করি। এক, একতা’র শক্তি অফুরন্ত।

এই সময়ে একটা কথা শোনা যায়, লেখকরাই কেবল বই কিনে পাঠকরা কিনে না, আপনি কি একমত?

আসলে যদি শুধু লেখকই বই কিনত তাহলে বইয়ের বিক্রি আরও বেশি হতো। বিষয় হচ্ছে, দেশে বইয়ের ভালো একটা বাজার আছে; কিন্তু সে বাজারটা কিছু লেখকের দখলে। দশ-বিশ জন লেখকের যে পরিমাণ বই বিক্রি হয় তার ঠিক সমান অন্য সব লেখক মিলে হয় না। এটাই মূলত সমস্যা। নতুন লেখকের পাঠক তৈরি হচ্ছে না। পাঠক একটা নিদির্ষ্ট বৃত্তের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।

বৃত্ত থেকে বের হতে কি করনীয়?

প্রথমত, নতুন, তরুণদের বই সব লাইব্রেরিতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বইমেলাকে শুধু ফেব্রুয়ারিতে আটকে রাখলে হবে না, পুরো বছর জুড়ে এর বিস্তার করতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের ‘আউট বই পড়া যাবে না’ এমন ম্যাসেজ দেওয়া থেকে শিক্ষক ও অভিভাবকদের বিরত থাকতে হবে। চতুর্থত, ভালো বই নিয়ে ফিচার, লেখালেখি করতে হবে; যাতে পাঠকের কাছে বই সম্পর্কে বার্তা পৌঁছে।

পাঠকরা জয়ন্ত জিল্লুর পরবর্তী বই কবে পাচ্ছে এবং নতুন কোন চমক আছে কিনা?

পরবর্তী বই সামনের অমর একুশে বইমেলা ২০১৭ তে। বইটা হবে কবিতার। এই বইটি প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে কিছুটা আলাদা হবে। চমকটা পাঠকই বুঝতে পারবে।

পাঠকের উদ্দেশ্যে যদি কিছু বলেন…

পাঠকের উদ্দেশ্যে বলব বই পড়ুন, বইয়ের গঠনমূলক সমালোচনা করুন, ভালো বইয়ের হদিস দিন অন্যকে।

আপনাকে ধন্যবাদ

আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

1 COMMENT

  1. ভালো লাগলো। জয়ন্ত জিল্লু আমার পছন্দের মানুষ, কবি। শুভেচ্ছা।

LEAVE A REPLY

*